অধ্যায় সত্তর: বিস্ময়কর পাণ্ডুলিপির অদ্ভুত জগত

ছোট দোকানের আশ্চর্য কাহিনি নীল তরুণ ঘোড়া আঁধার ভেদ করে ছুটে যায় 2397শব্দ 2026-03-20 06:18:56

এই পর্যন্ত চিন্তা করে আমি আর পরিবেশের উপযোগিতা নিয়ে মাথা ঘামালাম না, মনে মনে কয়েকবার সেই পাঁচ অক্ষরের মন্ত্র জপে ফেললাম। সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো মন যেন স্থির জলের মতো শান্ত, গা-টা আস্তে আস্তে শিথিল হয়ে এলো।

তারপর ছোট্ট নাক উঁচু ছেলেটা আমাকে যে পদ্ধতি শিখিয়েছিল, সেইরকম ভাবে চেষ্টায় মন দিলাম—চোখ দিয়ে নাকের দিকে তাকাই, নাক দিয়ে মুখের দিকে, মুখ দিয়ে মনে, মন দিয়ে শরীরের ভেতরে সত্যিকারের শক্তির প্রবাহ টের পেতে চেষ্টা করি।

এই ট্রেনের স্লিপার কামরায় দুই তলা বিছানার ব্যবস্থা, যাত্রীর অভাব নেই, প্রায় সব জায়গা ভর্তি। আমি নিচের বিছানায় চুপচাপ সাধনায় মগ্ন, ওপরে মোটা লোকটা ইতিমধ্যেই নাক ডাকছে।

আমাদের ঠিক উল্টোদিকে দুটি মহিলা, নিচের বিছানায় বসে আছেন এক তরুণী, চেহারায় সরলতা, ছাত্রীর মতো লাগে—সাদা শার্ট, জিন্স, পনিটেল, নাকে কালো ফ্রেমের চশমা, মোটা বইয়ের পাতা উল্টে দেখছেন।

এখন আগস্টের শেষ, আন্দাজ করি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে রিপোর্ট করতে যাচ্ছেন।

ওপরের বিছানায় আছেন ত্রিশের কোঠার এক মহিলা, গড়ন লম্বা, মুখে ভারী মেকআপ, পোশাকও বেশ ঝাঁ চকচকে—টাইট জ্যাকেট, তার সঙ্গে একেবারে ছোট স্কার্ট, পায়ে কালো মোজা, বিছানায় শুয়ে ফোনে কথা বলছেন, তার কণ্ঠ এত মিষ্টি যে শুনলে হজমের গোলমাল হয়।

দীর্ঘ সফরে দুই সুন্দরী সঙ্গিনী থাকাটা সাধারণত মনোরম ব্যাপার। কিন্তু পরিবেশের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে এক ঘন, টক, পচা পায়ের গন্ধ, বারবার হাওয়ায় ভেসে আসে, চোখ ঘুরে যায়।

প্রথমে ভাবলাম মোটা লোকটার দোষ, মাথা তুলে দেখি, সে তো জুতো পরে আছে, নিশ্চয়ই সে নয়। চারপাশে তাকিয়ে দেখি, আমাদের এই পাশে একমাত্র জুতো খুলে রেখেছেন ওপরে থাকা সেই মহিলা।

আমার নিঃশ্বাস আটকে, কপাল কুচকে তাকাতে নিচের ছাত্রীমতো মেয়েটি মুখ চেপে হাসে, চুপিচুপি আঙুল দেখিয়ে নিজের ওপরের বিছানার দিকে ইশারা করল।

কিছু বলার ছিল না। বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে কি বিশ্রী অবস্থা! আপনি এত সুন্দর সেজেছেন, দয়া করে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতায় একটু খেয়াল রাখুন না? সত্যিই বিরক্তিকর!

নজর বোলাতে গিয়ে দেখি, ওই মহিলার ভারী সাজানো মুখে ভ্রুর মাঝখানে কালো ছোপ, স্পষ্ট বোঝা যায়, তিনি সম্প্রতি কিছু অশুভ দেখেছেন। কেমন যেন মজা পেয়ে গেলাম, এ ধরনের অসভ্য আচরণের জন্য কোনো অদৃশ্য অপদেবতা জড়িয়ে থাকলে মন্দ হয় না।

মনে শান্তি এনে, তাকে আর পাত্তা না দিয়ে আবারও অন্তরের প্রকৃত শক্তির প্রবাহ অনুভব করতে লাগলাম।

ব্যাগে থাকা মোটা পাখিটা যেন কিছু একটা গুনগুন করল, হালকা আওয়াজ পেলাম। ভয় পেলাম, কেউ টের পেল কিনা, তাড়াতাড়ি মাথা তুলে লাগেজ রাখার তাকের দিকে তাকালাম।

তাকিয়ে দেখি, মাথার ওপর রাখা ব্যাগে যেন ক্ষীণ আলো জ্বলছে, টিমটিম করছে। সেই আলোটা উষ্ণ সাদা, খুব কোমল, যেন নিঃশ্বাসের মতো ধীরে ধীরে জ্বলছে।

বুঝতে পারলাম না। ব্যাগে তো মোটা পাখি ছাড়া আমাদের বদলানোর জামাকাপড় আর কিছু খাবার ছাড়া কিছু নেই, আলো জ্বলে কেন?

ব্যাগ খুলে দেখি, মোটা পাখিটা তো ঘুমিয়ে পড়েছে, আর আলো দিচ্ছে যে জিনিসটা, সেটা হল সেই চার ভাঁজ করা ভেড়ার চামড়ার টুকরোটা!

আগেও বলেছি, এই ভেড়ার চামড়াটা মোটা পাখির পুরনো কাঠের খাঁচা থেকে পাওয়া, ওপরে একটাও লেখা ছিল না, শুধু হলুদ হয়ে যাওয়া একটা চামড়া।

চারদিকে তাকালাম, ওপরে থাকা মহিলার পা থেকে আসা গন্ধওয়ালী এখনো ফোনে কথা বলছেন, নিচের ছাত্রীমেয়েটি একবার আমার দিকে তাকিয়ে আবার বইয়ে মন দিলেন, কেউ কিছু টের পেলেন না।

কৌতূহলী হয়ে চামড়াটা খুলতেই চমকে উঠলাম!

যেখানে আগে কোনো লেখা ছিল না, সেখানেই এখন স্পষ্টভাবে এক লাইনে লেখা—"সীমান্ত-বৃত্তান্ত"—সৃষ্টিকর্তা মন্ত্রগুরু মহাজ্ঞানী।

আমার বিস্ময় এখানেই থামেনি, এই মন্ত্রগুরু মহাজ্ঞানীর নাম আমার চেনা। মোটা পাখি আগেই বলেছিল, আমাদের অপদেবতা নিধন-সম্প্রদায়ের প্রথম গুরু, প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনিই!

এই লেখার অর্থ দেখে মনে হচ্ছে এটা কোনো বই, নাম "সীমান্ত-বৃত্তান্ত", আর লেখক স্বয়ং মহাজ্ঞানী।

মাথায় তালগোল পাকিয়ে গেল, প্রথমত বুঝলাম না, এই চামড়া কেন হঠাৎ করে লেখা দেখাচ্ছে, দ্বিতীয়ত এই "সীমান্ত-বৃত্তান্ত" মানে কী, আর এমন একটা বই মোটা পাখির খাঁচায় কেন লুকিয়ে ছিল।

বিস্ময়ে হতবাক হয়ে ওপরে ঘুমন্ত মোটা লোকটাকে ডেকে তুললাম, ওকে দেখাই। সে আধো-জাগা চোখে চামড়া দেখে বলে, আমার মাথা খারাপ হয়েছে, এখানে কিছু তো লেখা নেই!

হতবাক হয়ে আবার নিজে দেখি, সত্যি, লেখাগুলো কখন উধাও হয়ে গেছে কে জানে!

মোটা লোক ফের ঘুমিয়ে পড়ল, আর আমার কৌতূহল বেড়ে গেল। চামড়াটা হাঁটুতে রেখে উল্টেপাল্টে দেখতে লাগলাম।

এই চামড়াটা খুব ছোট, চার ভাঁজ করলে হাতের তালুর মতন হয়। আধঘণ্টা ঘাঁটাঘাঁটি করেও আর কোনো লেখা ফুটে উঠল না।

হতাশ হয়ে ওটা পাশে রেখে আবার ছোট নাক উঁচু ছেলেটার শেখানো পদ্ধতিতে ধ্যান করতে লাগলাম।

আসলে ড্রাগনের বাড়িতে কয়েক মাসের সাধনায় শরীরের ভেতরে শক্তির সামান্য প্রবাহ টের পাওয়া শিখেছি।

তবে সাধনা কম, তাই এই শক্তি ক্ষীণ নদীর মতো, আছে কি নেই বোঝা যায় না, সহজে নিয়ন্ত্রণও করা যায় না।

হঠাৎ দেখি, পাশে ফেলে রাখা চামড়া আবারও জ্বলজ্বল করছে! আনন্দে খুলে দেখি, এবারও নতুন করে লেখা ফুটে উঠেছে, তবে আগের চেয়ে একেবারে আলাদা।

লিখা আছে—"আদি সৃষ্টিতে, জল ও ভূমি পৃথক; বিশ্ব ভাগ হয়েছে মানব, অপদেবতা, দৈত্য, দেবতা, অসুর, পাতাল ছয় ভাগে, কখনো শেষ হয় না…"

বুঝলাম, এই চামড়ার লেখাগুলো প্রকাশ পেতে হলে আমার শরীরের শক্তি দিয়ে ওটাকে চালাতে হয়!

হাত কাঁপছিল, মনে হচ্ছিল বিরাট কোনো রহস্যের দরজা খুলে গেছে। প্রাণপণে শরীরের শক্তি অনুভব করতে লাগলাম, চামড়ার লেখাগুলোও পাল্টাতে থাকল।

"আদি সৃষ্টিতে, জল ও ভূমি পৃথক; বিশ্ব ভাগ হয়েছে মানব, অপদেবতা, দৈত্য, দেবতা, অসুর, পাতাল ছয় ভাগে, কখনো শেষ হয় না।
জল থেকে জন্ম মানব ও অপদেবতা; ভূমি থেকে দৈত্য, অদ্ভুত প্রাণী।
দেবতা—শ্রেষ্ঠ; অসুর—শাসক; এই রহস্য অজানা।
পাতাল, নরক, কেউ তার অবস্থান জানে না, কেউ বলে এক লাল নদী আছে, কেউ কখনো পৌঁছায়নি।
ছয় ভাগে তিন স্তর: মানব, অপদেবতা, দৈত্য, অদ্ভুত প্রাণী—সব মায়ার সৃষ্টি; দেবতা, অসুর—চূড়ান্ত স্তর; পাতাল—নরক, বিশৃঙ্খলা, একে বলে নরক-যন্ত্রণা…"

দুঃখের বিষয়, কয়েক ঘণ্টা ধরে মাথা ঝুঁকিয়ে থেকেও এই একশো-দেড়শো শব্দের বেশি আর কিছুই পেলাম না। তারপরে যত চেষ্টা করি, বারবার ওই একই লাইন ফিরে আসে।

আমার পড়াশোনা কম, আবার এই ভাষা অনেকটা পুরোনো, বুঝতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। আর এই কয়েক লাইনের অর্থও বড় অদ্ভুত।

সারমর্ম দাঁড়ায়, আমাদের এই পৃথিবী জন্মের সময় থেকেই ছয় ভাগে বিভক্ত—মানব, অপদেবতা, দৈত্য, দেবতা, অসুর আর পাতাল।

ছয় ভাগ আবার তিন স্তরে বিভক্ত—মানব, অপদেবতা, দৈত্য, অদ্ভুত প্রাণী—সব মায়ার সৃষ্টি; দেবতা, অসুর—চূড়ান্ত স্তর; পাতাল—নরক, বিশৃঙ্খলা।

এমন কথা শুনে মনে হয় যেন কোনো রূপকথার গল্প, বাস্তবের সঙ্গে মেলে না।

আমি যেহেতু সাধক, এই পর্যন্ত অপদেবতা আর দৈত্যে বিশ্বাস করি, পাতাল মানে লোককথার যমপুরী, এটাও মানা যায়।

কিন্তু দেবতা, অসুর এসব বিশ্বাস করা কঠিন।

এসব তো পুরাণের কাহিনি, গালগল্প ছাড়া কিছু নয়।

দেখা যাচ্ছে শুধু আমার গুরু নয়, গুরুজীর গুরু-ও তেমন বিশ্বাসযোগ্য নন, এমনকি প্রতিষ্ঠাতা গুরুজীর কথাও শুনে মনে হয় একেবারে ঠকবাজ!