সপ্তদশ অধ্যায়: কেবল সচ্চরিতার্থ সমিতিই চিনি
যুবক চিকিৎসক কথা শেষ করতেই সঙ্গে সঙ্গে আশেপাশের উপস্থিত জনতা তার কথার সমর্থনে গলা মেলাল, কারণ তাদের মনে হল কেবল ওই রক্তশোষক পরজীবীর রোগীকে আলাদা করে রাখলেই সবার জন্য নিরাপদ হবে। ইউননিয়াং দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে কথা বলতে পারছিল না, অথচ শে চিংতাং অনেক শান্ত ছিলেন। তিনি তখন ওই যুবক চিকিৎসককে বললেন, ‘‘তুমি কি মনে করো আমরা চীনা চিকিৎসায় রক্তশোষক রোগ সারানোটা কেবল অহংকার?’’
‘‘অবশ্যই, পাশ্চাত্য চিকিৎসা পরজীবী রোগ নিয়ে অনেক গভীর গবেষণা করেছে। আর তোমাদের চীনা চিকিৎসার ফলে রোগ সারে খুব ধীরে, এই রোগীদের জন্য এক মিনিট দেরি মানে আরও এক মিনিট বিপদে থাকা।’’
‘‘তাই রোগীর নিরাপত্তার কথা ভেবে বলছি, শে দাভু, তোমার উচিত তোমার ছুনশানহল থেকে রক্তশোষক রোগীদের আমাদের গু হাসপাতলে পাঠিয়ে দেওয়া। নইলে আবার কেউ এই রোগে সংক্রমিত হতে পারে।’’
এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই সবাই ছুনশানহলকে দোষারোপ করতে লাগল। এবার শে চিংতাং-এর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। পাশে দাঁড়িয়ে ঝৌ জিনফান প্রতিবাদ করল, ‘‘তুমি ঠিক কী বোঝাতে চাইছো? তুমি কি বলতে চাও গু হাসপাতালে যারা সংক্রমিত হয়েছে, তারা সবাই ছুনশানহলের ওই রোগীর থেকে সংক্রমিত?’’
‘‘তা আমরা জানি না, তবে ছুনশানহলে ওই রোগী আসার পর থেকেই একের পর এক সংক্রমণ হচ্ছে, এখানে কারণ-ফল স্পষ্ট।’’
ওই যুবতী চিকিৎসকও একরোখা হয়ে বলল, তার কথায় আশেপাশের অনেকে সায় দিল। হঠাৎই কারও কাশির শব্দ সবার তর্ক থামিয়ে দিল। সবাই ভয়ে তাকাল ছুনশানহলের পিছনের উঠান থেকে বেরিয়ে আসা এক পুরুষের দিকে।
সে আর কেউ নয়, ইউননিয়াং-এর দাদা। শরীরটাকে কষ্টে সামলে সামনে এল। পরজীবী তার শরীরটা একেবারে নিঃশেষ করে দিয়েছে, যদিও কিছুদিনের চিকিৎসায় তার ফুলে যাওয়া পেট অনেকটাই সঙ্কুচিত হয়েছে, তবু শরীরটি রীতিমতো কঙ্কালসার।
গালদুটি গভীরভাবে বসে গেছে, চোখের চারপাশে নীলচে ছাপ, দেখে মনে হয় কফিনে এক পা দিয়ে রাখা মানুষ, যার চেহারা দেখে গা শিউরে ওঠে।
‘‘আমি-ই ছুনশানহলে থাকা রক্তশোষক রোগী। আগে আমার কী দশা ছিল, আমার ছোট বোন জানে। শে দাভু যদি অসাধারণ চিকিৎসা না করতেন, আমি বেঁচে থাকব কি না, সেটাই অনিশ্চিত ছিল।’’
ইউননিয়াং দৌড়ে এসে দাদাকে ধরে ফেলল, আর সেই পুরুষটি ছুনশানহলের পক্ষে সাফাই গাইল।
দরজার কাছে দাঁড়ানো লোকেরা যখন জানল, এই হাড্ডিসার মানুষটিই ওই রোগী, তখন ভয় পেয়ে কয়েক কদম পেছনে সরে গেল, এমনকি গু হাসপাতালের দুই তরুণ চিকিৎসকও কয়েক ধাপ পিছিয়ে গেল।
‘‘রোগী, আমি বুঝি আপনি ছুনশানহলকে বাঁচাতে চাইছেন, কিন্তু এমন অবস্থার জন্য ছুনশানহলও দায়ী। আপনি আমাদের গু হাসপাতালে এলে আমরা আপনাকে সেরা চিকিৎসা দেব।’’
ওই যুবতী চিকিৎসক নাক-মুখ ঢেকে বলল।
পুরুষটি শান্ত স্বরে চোখ ঘুরিয়ে বলল, ‘‘আমার তোমাদের গু হাসপাতালের চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। আমি ছুনশানহলে চিকিৎসা নিয়ে ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছি।’’
‘‘আর আমার ও আমার ছোট বোনের এত টাকা নেই যে তোমাদের হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা করাতে পারি। মনে আছে, আমরা দু’জনে মিলে পরীক্ষা করার খরচটুকুও জোগাড় করতে পারিনি, তখনই তোমরা আমাকে বের করে দিয়েছিলে। তখন আমার রোগ অনেকটা বেড়ে গিয়েছিল।’’
তার কথা শেষ হতে না হতেই সবাই অবাক হয়ে দুই তরুণ চিকিৎসকের দিকে তাকাল।
পুরুষ চিকিৎসক নির্লজ্জভাবে বলল, ‘‘আমাদের হাসপাতালও তো ব্যবসা করে, বিনা পয়সায় কি চিকিৎসা সম্ভব? কয়েকশো টাকার ফি-ও যদি দিতে না পারো...’’
‘‘হ্যাঁ, আমি গরিব। তবে গরিব হলে কি চিকিৎসা করানোর অধিকার নেই? শে দাভু যদি আমাদের খুঁজে না পেতেন, ঔষধের খরচ না মাফ করতেন, আজও কি বেঁচে থাকতাম জানি না। হাসপাতাল নামেই, আসলে টাকা চোষার জায়গা। টাকা থাকলে ভেতরে ঢোকো, না থাকলে মরার অপেক্ষা করো, তাই তো?’’
লোকটি খানিক উত্তেজিত গলায় বলল, আবার কাশতে শুরু করল।
পুরুষ চিকিৎসকের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল, কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না। আশেপাশের জনতাও ফিসফিস করে বলতে লাগল, আগে গু হাসপাতালকে একটু ভালো লাগতেও পারে, কিন্তু এখন আর কোনো সহানুভূতি নেই; বরং আগেকার চড়া ফি-র কথাই মনে পড়ল।
‘‘দুঃখিত, এ বিষয়ে আমাদের হাসপাতালের ভুল হয়েছে। আপনি চাইলে আমাদের হাসপাতালে এলে আপনার চিকিৎসার খরচ বিশ শতাংশ ছাড় দেব। এতে নিশ্চয়ই সমস্যা হবে না।’’
ওই যুবতী চিকিৎসক পরিস্থিতি সামাল দিতে চাইলেন।
কিন্তু সেই পুরুষটি মুখ ঘুরিয়ে শে চিংতাং-এর দিকে কৃতজ্ঞতায় তাকিয়ে বলল, ‘‘আমি এখন আর তোমাদের গু হাসপাতালের ওপর বিশ্বাস করি না। আমার একমাত্র ভরসা ছুনশানহলের শে দাভু।’’
‘‘চীনা চিকিৎসা ভণ্ডামি ছাড়া কিছুই নয়। আপনি কি সত্যি ভণ্ড চিকিৎসকের হাতে নিজের প্রাণ ছেড়ে দেবেন? ও আপনাকে সারাতে পারবে না, উলটে প্রাণও যেতে পারে। কেবল পাশ্চাত্য চিকিৎসাই আপনাকে পুরোপুরি সুস্থ করতে পারে।’’
যুবতী চিকিৎসক কপালে ভাঁজ ফেলে বলল।
ইউননিয়াং দাদার পাশে দাঁড়িয়ে দৃঢ় স্বরে বলল, ‘‘এটা আপনাদের দেখার দরকার নেই। আমি জানি দাদা নিজের প্রাণ শে দাভুর হাতে দিতে রাজি, কারণ শে দাভুর মতো চিকিৎসকের কাছে আপনাদের মতো নাম কামানোর লোভ নেই, ওঁর চিকিৎসা নীতিতে বিশ্বাস আছে।’’
‘‘বোন ঠিক বলেছে। মরতে হলে মরব, তবু গু হাসপাতালে যাব না। আমি কেবল শে দাভুর ওপর বিশ্বাস করি।’’
পুরুষটি হয়তো সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারল না, কিন্তু তার কণ্ঠে ছিল অবিচল দৃঢ়তা।
চারপাশের লোকজনের মধ্যে কেউ কেউ তখন ‘বাহ!’ বলে উঠল, ভুলেই গিয়েছিল কেন তারা ছুনশানহলে এসেছিল— সেটাও ছুনশানহলের ওই রোগী গোপন করার কারণেই।
‘‘নির্বোধ, তোমাদের এই অজ্ঞতাই প্রাণ কেড়ে নেবে।’’
মেয়েটি ক্ষুব্ধ হয়ে বলে চলে গেল, ছেলেটিও আর দেরি করল না। তারা এসেছিল ছুনশানহলের জনপ্রিয়তায় ধাক্কা দিতে এবং ওই রোগীকে নিয়ে যেতে।
এটা ছিল তাদের বিভাগের প্রধানের নির্দেশ, কারণ প্রধানও মনে করতেন কেবল পাশ্চাত্য চিকিৎসাই এই রোগ পুরোপুরি সারাতে পারে, চীনা চিকিৎসার সে ক্ষমতা নেই।
ভাবছিল তারা শান্তিপূর্ণভাবে রোগীকে নিয়ে যাবে, কিন্তু তরুণ চিকিৎসকদের অধৈর্যতায় সব গুলিয়ে গেল।
চিকিৎসকরা চলে যেতেই উৎসাহী জনতাও ধীরে ধীরে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল।